সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধিনায়ক রুমানা!!

ব্যাটিং-বোলিংয়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক রুমানা আহমেদ। ৩০ ওয়ানডেতে ৬৪৯ রান, ৩৪ উইকেট—বাংলাদেশে মেয়েদের ক্রিকেটে দুটিতেই তিনি সবার ওপরে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে প্রথম হ্যাটট্রিক করে জেতান দলকে।

ভাগ্যিস রুমানা আহমেদ পত্রিকায় খবরটা পড়েছিলেন! ‘খুলনার দৈনিক পূর্বাঞ্চল দেখে প্রথম জানতে পারলাম মেয়েদের জাতীয় ক্রিকেট দল আছে।’ রুমানার স্মৃতিতে ভেসে আসে নয় বছর আগের কথা। ওই খবর একটা স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিল তাঁর মনে।

দুই দশক ধরে খুলনা বিভাগ যেন রূপ নিয়েছে ক্রিকেটার তৈরির ‘কারখানায়’! তা ছেলেদের ক্রিকেট বলুন কিংবা মেয়েদের। খুলনা থেকে উঠে আসা সালমা খাতুন, আয়েশা রহমানদের দেখে রুমানা স্বপ্ন দেখেছেন একদিন তিনিও খেলবেন বাংলাদেশ দলে। অধিনায়ক ফিরে যান তাঁর শুরুর দিনগুলোয়, ‘২০০৮ সালের কথা। সালমা-শুকতারা (আয়েশা) আপুকে দেখেছি জাতীয় দলে খেলতে। তাঁদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম গিয়েছিলাম খুলনা জেলা স্টেডিয়াম। সেখানে পিলু স্যারের (কোচ ইমতিয়াজ হোসেন) কাছে আমার আনুষ্ঠানিক ক্রিকেটের শুরু।’

শুরু তো হলো, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার পথটা খুব একটা মসৃণ ছিল না খুলনার খালিশপুরের মেয়ে রুমানার। সব বাধা তিনি উতরেছেন প্রতিভা, পরিশ্রম আর পরিবারের উৎসাহে। ‘কঠিন সময় গেছে জাতীয় দলে ঢোকার আগ পর্যন্ত। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তখন। সামাজিক অনেক বাধাবিপত্তি ছিল। মেয়ে হয়ে কেন ক্রিকেট খেলছি, এটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন শুনতে হয়েছে। তবে আমার পরিবার সব সময়ই আমার পাশে থেকেছে। আমার ভাইবোনেরা আমাকে নিয়মিত মাঠে নিয়ে গেছেন।’

রুমানা আরেকটা ধাক্কা খান জাতীয় দলে ঢোকার পর। কঠিন পর্বের গল্পটা শুনুন তাঁর কাছেই, ‘পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে ২০০৯ সালে মেয়েদের একটা ত্রিদেশীয় সিরিজ হয়েছিল বাংলাদেশে। ওই সিরিজে দল থেকে বাদ পড়ি আমি। কেন বাদ পড়ি এখনো জানি না। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখন নিজের ভেতর জেদ এল, যদি ঢুকি সেরা হয়েই ঢুকব।’

আর এতেই বিরাট একটা পরিবর্তন আসে রুমানার মধ্যে। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন অফ স্পিনার হিসেবে। কিন্তু দল থেকে বাদ পড়ায় রুমানা বোলিংয়ের ধরনই পাল্টে ফেলেন। আয়ত্ত করেন ক্রিকেটের কঠিন এক শিল্প লেগ স্পিন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ মেয়েদের দলের একমাত্র লেগ স্পিনার তিনিই। কেন অফ স্পিনার থেকে লেগ স্পিনার হলেন? ‘দলে অনেক অফ স্পিনার। আর শুরু থেকেই লেগ স্পিনটা পারতাম। সবার কাছ থেকে তখন সমর্থন পাইনি। তবে বোলিংয়ে ধরন পাল্টে ফেলাটা আমাকে ভীষণ কাজে দিয়েছে।’ বলছিলেন রুমানা।

রুমানার ক্যারিয়ারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে গত বছরের নভেম্বরে। মেয়েদের নেতৃত্বের ভারটা দেওয়া হয়েছে তাঁর কাঁধে। এতে একটি স্বপ্নই পূরণ হয়েছে তাঁর, ‘অধিনায়কত্ব পাওয়াটা আমার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। সালমা আপুকে যখন অধিনায়কত্ব করতে দেখেছি, তখন অবশ্য স্বপ্ন দেখতাম একদিন মেয়েদের দলের অধিনায়ক হব। তবে এভাবে হঠাৎ পেয়ে যাব ভাবিনি!’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল এগোচ্ছে হোঁচট খেতে খেতে। ২০১১ সালের নভেম্বরে প্রথম ওয়ানডে খেলা বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৩০ ম্যাচে জিতেছে ৭টিতে। এর মধ্যে ৩টি জয় আয়ারল্যান্ড, ২টি করে পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। টি-টোয়েন্টিতেও সাফল্য পায়নি বলার মতো। ৩৪ ম্যাচে জয় ৫টি। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ ফিরেছে বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই না করার হতাশা নিয়ে।

রুমানা বললেন, সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাটা বেশি হওয়ার আসল কারণ অনভিজ্ঞতা, ‘শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে খেলে বুঝতে পারছি আমরা কতটা পিছিয়ে আছি। তবে তাদের চেয়ে খুব যে পিছিয়ে তা নয়। আমাদের খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ হয় না। আমরা পিছিয়ে আছি অভিজ্ঞতায়।’

ছেলেদের মতো বাংলাদেশের মেয়েদের দলও আত্মর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্য পাবে এই আশা তাঁর, ‘যত বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাব, তত দ্রুত এগিয়ে যাব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন ছেলেদের দল ভীষণ ব্যস্ত। আমরাও যদি তাদের মতো বেশি বেশি খেলার সুযোগ পাই, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা দ্রুত এগোবে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি।’

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s