অপেক্ষা মুমিনুলের সেরা ফর্মে প্রত্যাবর্তনের

অপেক্ষা-মুমিনুলের-সেরা-ফর্মে-প্রত্যাবর্তনেরঅস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার আর তাদের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে চলমান বিবাদ একটি স্থিতিশীল অবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলেই আন্দাজ করা যায়। আর পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশ খুব গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।

আগস্টের শেষ দিকে বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে অজিদের। এবং আসন্ন সেই সিরিজটি ইতিমধ্যেই বেশ আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।

টাইগারদের জন্য এটি একটি বিরল সুযোগ অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে পাঁচদিনের ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে নামার। এবং বিশেষ করে কক্সবাজারের এক তরুণের জন্য এটিকে বলা যায় একটি সুবর্ণ সুযোগ, তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার।

বাঁ-হাতি তরুণ ব্যাটসম্যান মুমিনুল হকের টেস্ট অভিষেক হয় ২০১৩ সালের মার্চে, শ্রীলংকার বিপক্ষে গলে। বড় স্কোরের ওই ম্যাচে তিনি নিজের খেলা একমাত্র ইনিংসে ৫৫ রান করেন।

মুমিনুল তার প্রাথমিক সাফল্য অব্যহত রাখেন পরের ম্যাচেও। কলম্বোয় আরও একটি অর্ধশতক হাঁকান তিনি। আরও বড় সাফল্য আসে পরের মৌসুমে, এবং টেস্ট অভিষেকের মাত্র এক বছরের মাথায়ই তিনি পরিণত হন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যানে।

তিনি ২০১৩-১৪ মৌসুম শুরু করেন চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮১ রানের এক অনবদ্য ইনিংস দিয়ে। ঢাকায় পরের ম্যাচে খেলেন ১২৬* রানের আরও একটি নজরকাড়া ইনিংস। সবমিলিয়ে ওই দুই ম্যাচের সিরিজে তিনি করেন ৩৭৬ রান, সাথে ছিল ১৮৮ রানের অবিশ্বাস্য গড়।

2514010338651882640.gif

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুমিনুল আরও একটি অপরাজিত শতকের মালিক হন, এবার চট্টগ্রামে শ্রীলংকার বিপক্ষে। ২০১৩-১৪ সালের শেষে, মাত্র সাত ম্যাচে ১৩ ইনিংস খেলা মুমিনুলের টেস্ট গড় ছিল ৭৫.৫। ডন ব্র্যাডমানকে তখনও মনে হচ্ছিল দূর আকাশের তারা। কিন্তু এ কথাও সত্য যে পরিসংখ্যান মুমিনুলকে দাঁড়া করিয়েছিল সর্বকালের সেরাদের সাথে এক কাতারে।

মুমিনুলের ব্যাটিংয়ে খুব আগ্রাসী কোন ব্যাপার ছিল না। তিনি চার নম্বর পজিশনে খুব নীরবে নিজের ইনিংস গড়ে তুলতেন। অধিকাংশ খর্বাকৃতির বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানদের মত তিনি নিয়মিত গালি-পয়েন্ট অঞ্চলে খেলতেন। তিনি ডেভিড গাওয়ার বা ব্রায়ান লারাদের মত অপার সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন না। তার ভূমিকা ছিল অনেকটা অ্যালান বোর্ডার বা ল্যারি গোমজের মত, একজন রান সঞ্চায়কের।

চুপচাপ স্বভাবের এই ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসাধারণ সাফল্যের পরও সবসময় লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন, তাকে নিয়ে বিশেষ মাতামাতি কখনোই হয়নি। সাকিব-তামিমদের মত তার মুখও রাস্তায় রাস্তায় প্রতিটি বিলবোর্ডে দেখা যেত না। কিন্তু তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশ টেস্ট দলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং মনে করা হচ্ছিল নিয়তি বুঝি তার জন্য দারুণ কিছু নিয়েই অপেক্ষা করছে।

উইন্ডিজের বিপক্ষে সেপ্টেম্বরের ছোট ট্যুরে মুমিনুল খুব একটা ভালো করতে পারেননি। কিন্তু পরের সিরিজেই তিনি স্বরূপে ফেরেন। জিম্বাবুয়ের দুর্বল বোলিং আক্রমনের বিপক্ষে নভেম্বরে নিজের প্রিয় ভেন্যু চট্টগ্রামে অপরাজিত ১৩১ রানের অনন্য এক ইনিংস খেলেন। তখনও তার গড় ছিল ৭০ এর উপরে, এবং চট্টগ্রামে তার রেকর্ড তো আরও অসাধারণ – ১৮১ ও ২২* (নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে), ১৩ ও ১০০* (শ্রীলংকার বিপক্ষে) এবং ৪৮ ও ১৩১* (জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে)।

5172142730687196526.gif

কিন্তু তারপরও আড়াই বছর বাদে, এই মুহূর্তে ২২ টেস্ট খেলে ফেলার পর মুমিনুলের গড় মাত্র ৪৬.৮৮। টেস্টে সেই চার শতকের পর নতুন করে আর কোন তিন অংকের স্কোর তিনি লেখাতে পারেননি নিজের নামের পাশে। এমনকি, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ দিকে মোড় নেয় যে গত মার্চে গলে সাত ও পাঁচ করার পর তাকে দল থেকেও বাদ পড়তে হয়। নির্বাচকরা যদিও ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন যে আগামী মৌসুমে আবারও মুমিনুলকে দেখা যাবে জাতীয় দলে, কিন্তু এ প্রশ্ন থেকেই যায় যে মুমিনুল আদৌ কতটা সফল হবেন নিজের শুরুর দিককার প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে।

তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার আগে, তার অতীত পরিসংখ্যান নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। এই বিষয়টি এখন আর অজানা কিছু নয় যে আজকাল অনেক তরুণই সীমিত ওভারের ফরম্যাটে থিতু হওয়ার আগেই টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে দারুণ সম্ভাবনা দেখান, কিন্তু এক পর্যায়ে এসে তাদের টেস্ট ক্যারিয়ারের অকালমৃত্যু ঘটে।

মুমিনুলের ক্ষেত্রে অবশ্য এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। যদিও তিনি টেস্টের আগেই একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ৫০-ওভার বা ২০-ওভারের ক্রিকেটে তিনি কখনোই উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্যের দেখা পাননি। আর সৌম্য সরকারের উত্থান তো তাকে সীমিত ওভারের চিত্র থেকে একদম বেরই করে দিয়েছে।

মুমিনুল সর্বশেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে, ২০১৫ বিশ্বকাপে শ্রীলংকার বিপক্ষে। সেখানে মাত্র এক রান করে আউট হয়েছিলেন তিনি। তারচেয়েও বেশি সমালোচিত হয়েছিলেন কুমার সাঙ্গাকারার ক্যাচ মাটিতে ফেলে – শ্রীলংকান কিংবদন্তী পরে সেই ইনিংসকে নিয়ে যান তিন অংকের ঘরে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্লিষ্ট সকলেই মুমিনুলকে মনে করে একজন টেস্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আর সে কারণেই টেস্ট ক্রিকেটে তার সাম্প্রতিক ব্যর্থতা আমাদের জন্য আরও বেশি হতাশাজনক।

একটি মজার তথ্য হলো, তার প্রথম তিনটি শতকই এসেছে চার নম্বরে ব্যাট করে। কিন্তু অন্যান্য ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার খেসারত হিসেবে এক সময় তাকে পাঠানো হতে থাকে তিন নম্বরে, যেখানে তিনি এখন পর্যন্ত স্রেফ একটি শতকের দেখা পেয়েছেন।

13302265579657866729

তারপরও, এটিকে খুব বড় কোন বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। উপমহাদেশীয় কন্ডিশনে খেলার ক্ষেত্রে তো নয়ই (তার খেলা ২২ টেস্টের মধ্যে চারটি বাদে বাকি সবগুলোই ছিল উপমহাদেশে)।

অধিকাংশ সময়েই উপমহাদেশীয় পিচ ধীরগতির হয়ে থাকে, সাথে থাকে লো বাউন্স। এজন্য ধীরস্থির স্বভাবের ব্যাটসম্যানেরা সহজেই অনেক রান তুলতে পারেন। আর তাই মুমিনুল তিনে ব্যাট করলেন নাকি চারে, সেটি খুব বড় কোন প্রভাবক রূপে কাজ করার কথা নয়। বিরাট কোহলি টেস্টে ব্যাট করতে নামেন চারে, তিন নম্বর জায়গাটি তিনি ছেড়ে দিয়েছেন চেতেশ্বর পুজারাকে।

টেকনিক্যাল দিক থেকে মুমিনুলের ব্যাটিংয়ে কিছু উন্নতির জায়গা রয়েছে। নিজের প্রথম দিককার টেস্টগুলিতে তিনি নির্দ্বিধায় স্কয়ার অফ দ্য অফসাইডের দিকে খেলতে পারতেন। কিন্তু এখন অবশ্যই প্রতিপক্ষেরা তার শক্তিমত্তার দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে দেখা গেছে প্রতিপক্ষ দল তাকে বল করছে অফসাইডে অনেক বেশি পরিমাণে ফিল্ডিং সেট করে। আর এ কারনে রান তোলা মুমিনুলের জন্য অনেক বেশি দুরূহ হয়ে পড়েছে।

মুমিনুল অনেকবার গালি অঞ্চলে ক্যাচে পরিণত হয়েছেন। লেগ সাইড থেকে রান তোলার আশায় তিনি প্রায়সই বলের দিকের বিপরীতে গিয়ে শট খেলার চেষ্টা করে থাকেন। তার এই প্রবণতা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ, এবং এটিও খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে তার সর্বশেষ চার ডিসমিসালের তিনটিরই নেপথ্যের কারণ হলো এলবিডব্লু। মমিনুলের অতি অবশ্যই স্ট্রোকের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষত লেগ সাইডে শট খেলার ক্ষেত্রে।

সবমিলিয়ে অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, আমরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তার থেকে ভালো পারফরম্যান্সের আশায়, বিশেষ করে তার প্রিয় ভেন্যু চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচটিতে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কঠিন ট্যুরের আগে মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠা এই মুহুর্তে মুমিনুলের জন্য খুবই দরকার।

আগে যেমনটা বলা হয়েছে, মুমিনুল উপমহাদেশের বাইরে খুব কমই ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। এবং ধারণা করা যায় দক্ষিণ আফ্রিকান বোলাররা অফ স্টাম্পের বাইরে একের পর এক শর্ট পিচ ডেলিভারির মাধ্যমে তার কঠিন পরীক্ষাই নেবেন।

যদিও টেস্ট ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দল কখনোই আমাদের আশার পূর্নাঙ্গ প্রতিদান দিতে পারেনি, তারপরও সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর মত ব্যাটসম্যানদের কল্যাণে আমাদের মিডল অর্ডার আগের তুলনায় কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা লাভ করেছে।

যাইহোক, অন্যান্য বড় দলের মত আমাদেরও এমন একজনকে প্রয়োজন যে ধারাবাহিকভাবে তিন নম্বরে ভালো ব্যাটিং করে যেতে সক্ষম। মুমিনুলের মাঝে সেরকম টেম্পারমেন্ট রয়েছে। এবং এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আর কোন ব্যাটসম্যান নেই যিনি মুমিনুলের চেয়েও ভালোভাবে তিন নম্বরে ব্যাটিং করার যোগ্যতা রাখেন। তাই আমরা অপেক্ষায় আছি মুমিনুলের সেরা ফর্মে প্রত্যাবর্তনের।

(লেখাটির মূল রচয়িতা রফিকুল আমির। অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যম ‘দ্য রোর’-এ প্রকাশিত লেখাটি টাইগার ক্রিকেটের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করেছেন নাসিম হোসেন)

14569378820129554818.gif

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s